টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রামে নিজেদের চাঁদার টাকায় ৬০ শতাংশ জমি কিনে খেলার মাঠের স্বপ্ন পূরণ করেছেন গ্রামবাসী। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের খবর প্রকাশের পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এবং সাবেক জাতীয় ফুটবলার আমিনুল হক ওই মাঠের জন্য আরও জমি উপহার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে সময়ের কণ্ঠস্বরসহ একাধিক গণমাধ্যমে প্রশংসনীয় এই উদ্যোগের খবর নজরে এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। এ নিয়ে আজ রবিবার (৩১ অক্টোবর) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বললেন, ‘বাবুপুরবাসীর এই অনন্য উদ্যোগের ভিডিও ফুটেজ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারপ্রাপ্ত সচিবকে টাঙ্গাইলের ডিসি ও দেলদুয়ারের ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সদিচ্ছা বাস্তবায়ন করতেই মূলত এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে ওই গ্রামবাসীর পাশে থেকে একটি পরিপূর্ণ ও আধুনিক খেলার মাঠ উপহার দেওয়া যায়।’
মাঠের বাকি জমি কিনতে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। সংবাদ সম্মেলনে এডিসি জেনারেলের উপস্থাপিত ৪ কোটি ৪১ লাখ টাকার সামগ্রিক বাজেট ও সম্ভাব্যতা যাচাই সাপেক্ষে দ্রুত কাজ শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোররা যখন স্মার্টফোন ও মাদকের দিকে ঝুঁকছে, তখন তাদের মাঠে ফেরাতে বাবুপুর গ্রামের সচেতন বাসিন্দারা এই অনুকরণীয় উদ্যোগ নেন। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় কেনা হয়েছে মাঠের জমি। বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে সম্প্রতি সেই জমির দখল বুঝে নিয়েছেন গ্রামবাসী।
জানা যায়, সাত শতাধিক পরিবার ও সাড়ে তিন হাজার জনসংখ্যার এই গ্রামে কোনো নির্দিষ্ট খেলার মাঠ ছিল না। ধান কাটার পর ফাঁকা কৃষিজমিতে খেলাধুলার সুযোগ মিললেও আবাদ শুরু হলে তা বন্ধ হয়ে যেত। এতে বছরজুড়েই খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল নতুন প্রজন্ম।
সমস্যার স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগী হন গ্রামের সন্তান এস এম ইকবাল মাহমুদ ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলম। তাদের উদ্যোগে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিত্তবানরাও এগিয়ে আসেন। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ ২০০ বা ৫০০ টাকা, আবার কেউ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা করেন।
গত ৮ সেপ্টেম্বর এক মতবিনিময় সভার পর গ্রামবাসীর সম্মিলিত অর্থায়নে ইকবাল হোসেন সুজনের কাছ থেকে প্রতি শতাংশ ৫২ হাজার টাকা দরে ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়। এর বাইরে জমির মালিক নিজেও এক শতাংশ জমি দান করেন। গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে জমিটি গ্রামবাসীর কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এদিন উৎসবের আমেজে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে জমিতে সমবেত হন বিভিন্ন বয়সি মানুষ এবং সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
মাঠ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম বলেন, 'আপাতত ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এর পাশেই আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ১২০ শতাংশ জমি পাওয়া গেলে একটি মানসম্মত খেলার মাঠ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।'
অপর উদ্যোক্তা এস এম ইকবাল মাহমুদ বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরে আমরা একটি খেলার মাঠের পরিকল্পনা করছিলাম, অবশেষে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তা সফল হয়েছে।'
নতুন মাঠ পেয়ে উচ্ছ্বসিত গ্রামের কিশোর রফিক মিয়া বলে, 'আগে ধান কাটা হলে ক্ষেতে গিয়ে খেলতাম, ফসল বুনলে খেলা বন্ধ হয়ে যেত। এখন সারা বছরই খেলতে পারব, তাই খুব ভালো লাগছে।'
স্থানীয় হোমিও চিকিৎসক রহমান মিয়া বলেন, 'অনেক চেষ্টার পর নিজেদের উদ্যোগে মাঠ পেয়েছি। আশা করি, এই মাঠের খেলোয়াড়রাই একদিন বিশ্ব জয় করবে।'
সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা বলেন, 'সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্য ছাড়া নিজেদের উদ্যোগে খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার বিষয়টি সত্যিই প্রশংসনীয়। তাদের দেখে অনেকেই অনুপ্রাণিত হবে।'
ইখা