শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে কোটি টাকা মূল্যের সরকারি সম্পত্তিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে মো. জুলহাস নামে এক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে। গত এক মাস ধরে এ দখলদারি চললেও বিষয়টি নিয়ে উদাসীন প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই সরকারি সম্পদ দখলের এই মহোৎসব চলছে। সম্পত্তিটি উদ্ধারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
উপজেলা ভূমি অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মহিষার ইউনিয়নের ২১ নম্বর সাজানপুর মৌজায় ২৬৭ দাগে ১/১ খতিয়ানে ১৯৭৪-৭৫ সালে সরকারের কাছ থেকে ৯০ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত নেন আবুল কালাম আজাদ ও তাঁর চাচা নূর ইসলাম ছৈয়াল। এরপর ১৯৯৫ সালে বিআরএস রেকর্ডে জমিটি বাংলাদেশ সরকারের নামে নথিভুক্ত হয়। জমিটির মালিক সরকার হলেও সেটি দখলে রাখেন আবুল কালাম আজাদ ও নূর ইসলাম ছৈয়াল।
সম্প্রতি অনুমতি ছাড়াই সেখানে পাকা স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা চালানো হয়। খবর পেয়ে গত ২৮ জুলাই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় সেখানে অভিযান চালান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এম রাফসান রাব্বি। তিনি জমির মালিক ‘বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক, শরীয়তপুর’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেন এবং সীমানা নির্ধারণ করে লাল নিশানা দিয়ে আসেন। অভিযানের খবর পেয়ে জমির মালিক দাবি করা আবুল কালাম আজাদের ছেলে মো. জুলহাস ও নির্মাণশ্রমিকেরা সেখান থেকে পালিয়ে যান।
এরপর চলতি বছরের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ সরকার পক্ষকে বিবাদী করে শরীয়তপুর সহকারী জজ আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন মো. জুলহাস (মামলা নম্বর: ২৩৪/২৬)। আদালত ওই জমিতে স্থিতাবস্থা (অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা) বজায় রাখার আদেশ দেন। এদিকে আদালতের আদেশ অমান্য এবং উপজেলা ভূমি অফিসের টাঙানো সাইনবোর্ড উপড়ে ফেলে সেই জমিতে ভবনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন জুলহাসের ভাই আশিক ছৈয়াল।
মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে সাজানপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক নিয়ে ভবনের ঢালাইয়ের কাজ করছেন আশিক ছৈয়াল। সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে তিনি দাবি করেন, সরকারের বিরুদ্ধে করা মামলায় তিনি রায় পেয়েছেন। তবে রায়ের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে রাজী হননি। প্রকাশ্যে এমন অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও বিষয়টি জেনেও নীরব ভূমিকায় রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
এ বিষয়ে ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর আহম্মেদ ছৈয়াল বলেন, "১৯৭৪ সালে আবুল কালাম আজাদ ও নূর ইসলাম সরকারের কাছ থেকে ৯০ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত নেন। এরপর ১৯৭৯ সালে বন্দোবস্তের শর্ত ভঙ্গ করে জমি বিক্রি করেন আবুল কালাম আজাদ। বিষয়টি জানাজানি হলে ২০০৮ সালে আদালতে মামলা দায়েরের পর তাঁদের বন্দোবস্ত বাতিল করা হয়। এরপর থেকে জমিটি আবুল কালাম আজাদের ছেলেরা জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন। ২৮ জুলাই ভূমি অফিস সাইনবোর্ড ও লাল নিশানা দিয়ে যাওয়ার দুদিন পরই তা উপড়ে ফেলে আবার কাজ শুরু করে তারা। মামলা চলমান ও নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সরকারি জমিতে কীভাবে ভবন নির্মাণ করছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।"
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমীন বলেন, "সরকারের জমি দখল হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রশাসন নীরব। আদালতের নিষেধাজ্ঞাও তারা মানছে না। স্থায়ীভাবে দখলের জন্যই এই স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রশাসনকে জানিয়েও কাজ বন্ধ করা যায়নি।"
দখলদার আশিক ছৈয়াল সম্পত্তিটি নিজের দাবি করে বলেন, "দেশ স্বাধীনের পর থেকেই আমরা এটি ভোগদখল করে আসছি। সরকারি জমি দখল করতে পারি বিধায় দখল করি। আদালতে মামলা চলমান, কথা থাকলে আদালতে গিয়ে বলুন। জমি কতটুকু খাস, তা আদালত বুঝবে। কোর্ট থেকে লোক এসে দেখে গেছে, সাইনবোর্ড সরিয়ে নিয়েছে। আমাদের কাজ করার অনুমতি দিয়েছে বলেই কাজ করছি।"
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এম রাফসান রাব্বি বলেন, সাজানপুরে খাস জমিতে ভবন নির্মাণের খবর পেয়ে আমরা অভিযান চালিয়ে সরকারি সাইনবোর্ড ও সীমানা টাঙিয়ে দিয়ে আসি। পরবর্তীতে তারা দেওয়ানি মামলা করলে আদালত স্থিতাবস্থা জারি করেন। কয়েকদিন ধরে শুনছি তারা পুনরায় কাজ শুরু করেছে। আদালতের আদেশ অমান্য করার বিষয়ে আমরা লিখিতভাবে আদালতকে জানাব। পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা ও শাস্তির বিষয় আদালত নির্ধারণ করবেন।
পিএম