সারা দেশে একযোগে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আজ থেকে শুরু হলো ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। প্রথম দিনে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বাংলা প্রথমপত্র, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আলিমের কোরআন মাজিদ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি (বিএমটি) বাংলা-২ বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের পরীক্ষায় সর্বমোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই)সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হয়ে চলবে দুপুর ১টা পর্যন্ত। দ্বিতীয় শিফটের পরীক্ষা হবে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে।
গতকাল বুধবার (১ জুলাই) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষার এই সার্বিক প্রস্তুতি ও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিনসহ বিভিন্ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অভিন্ন প্রশ্নপত্র ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা : শিক্ষামন্ত্রী জানান, এবারের পরীক্ষা মোট ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রের অধীনে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হবে। এই বছরই প্রথম ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে সম্পূর্ণ অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হবে।
পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্থাপন করা হয়েছে একটি ‘সিসিটিভি ক্যামেরা মনিটরিং সেল’, যেখান থেকে বসে দেশের যেকোনও প্রান্তের যেকোনও কেন্দ্রের পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের শরীরে থাকবে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও নকল প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখবে।
পরীক্ষা সূচি ও বিশেষ ব্যবস্থা: এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ৭৭টি বিষয়ে ২১ দিনে পরীক্ষা সম্পন্ন হবে। পরীক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে জানানো হয়েছে, সপ্তাহের যেদিন পরীক্ষা থাকবে না, সেদিন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম বা ক্লাস যথারীতি পরিচালিত হবে।
মন্ত্রী জানান, নকলের জন্য খ্যাত বা বিতর্কিত ভেন্যু কেন্দ্রগুলো এবার পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। তবে হাওর, পার্বত্য অঞ্চল এবং দুর্গম চরাঞ্চলের পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতের কথা বিবেচনা করে কিছু দূরবর্তী ভেন্যু কেন্দ্র বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া ‘সেভেন্থ ডে অ্যাডভান্টিস্ট’ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় শনিবারের পরীক্ষাগুলো কেন্দ্রের ভেতরেই সূর্যাস্তের পর অনুষ্ঠিত হবে।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার নিয়মিত শিক্ষার্থীর তথ্য: ২০২৬ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একাদশ শ্রেণিতে (২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষ) ১১৮৬৪৬১ জন শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেন। তার মধ্যে ৭৯৪৪৭৭ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেন। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৯১৯৮৪ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় ফরম পূরণ করেনি। ফরম পূরণ না করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আওতায় আলিম প্রথম বর্ষে (২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষ) ১৩৯৯২৯ জন শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেন। তার মধ্যে ৭৮২৬৯ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেন। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬১৬৬০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় ফরম পূরণ করেনি। ফরম পূরণ না করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একাদশ শ্রেণিতে (ভোকেশনাল) (২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষ) ১৬৫৫৪২ জন শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেন। তার মধ্যে ৭৫১৯৭ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেন। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯০৩৪৫ জন পরীক্ষায় ফরম পূরণ করেননি। ফরম পূরণ না করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে এবং অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন এবং মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ২ লাখ ৮৬৯ জন। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৬ লাখ ২১ হাজার ৯৬৯ জন এবং ছাত্রী ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৪ জন। গত বছরের তুলনায় পরীক্ষার্থী বেড়েছে ১৯ হাজার ৪৭২ জন।
পরীক্ষা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে শিক্ষা বোর্ডগুলো ৩৫ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, কেন্দ্র পরিচালনা, পরীক্ষার্থী প্রবেশ, কক্ষ ব্যবস্থাপনা, উত্তরপত্র সংরক্ষণ এবং ডিজিটাল নজরদারির বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য একজন করে কক্ষপরিদর্শক দায়িত্ব পালন করবেন। তবে কোনো কক্ষে দুইজনের কম পরিদর্শক রাখা যাবে না। পরীক্ষার্থীদের বসার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে।
প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষা শুরুর তিন দিন আগে ট্রেজারি বা থানা লকারে সংরক্ষিত প্রশ্নপত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যাচাই করা হয়েছে। পরীক্ষার দিন ট্যাগ অফিসার ও পুলিশের পাহারায় প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে পৌঁছানো হবে। মোবাইলের মাধ্যমে নির্ধারিত সেট কোড পাওয়ার পরই প্রশ্নপত্র খোলা যাবে। নির্ধারিত সেটের বাইরে কোনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এবার দেশের ২ হাজার ৯৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১৪৫টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার ৪০টি রাজধানী ঢাকায়।
এইচএ