এইমাত্র
  • তারাগঞ্জে সিঁদ কেটে চুরি, নগদ টাকা-স্বর্ণালঙ্কার লুট
  • মাদক কারবারে বাধা দেওয়ায় মিরসরাইয়ে ছেলের হাতে বাবা খুন
  • কালিয়াকৈরে কৃত্রিমভাবে কলা পাকানোর অভিযোগ
  • কুমিল্লায় পৌঁছেছেন তারেক রহমান
  • ফারাক্কা দিবসে রাজশাহীতে মানববন্ধন
  • সিংড়ায় দুর্ধর্ষ ডাকাতি, ১২ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট
  • তাহিরপুরে মাদকসহ যুবক আটক
  • প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গজারিয়ায় সর্বস্তরের মানুষের সংবর্ধনা
  • ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস আজ
  • ট্রেনে ঈদ যাত্রার ২৬ মে’র টিকিট বিক্রি চলছে
  • আজ শনিবার, ২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ | ১৬ মে, ২০২৬
    জাতীয়

    রাজনৈতিক-পরিবেশ আন্দোলনের ঐতিহাসিক অধ্যায় ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ

    সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
    সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

    রাজনৈতিক-পরিবেশ আন্দোলনের ঐতিহাসিক অধ্যায় ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ

    সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
    ছবি: সংগৃহীত

    ১৬ মে,  ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস আজ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাসে ফারাক্কা লংমার্চ একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে এমন সোচ্চার জনমত ফারাক্কা লংমার্চের আগে-পরে কখনো দেখা যায়নি। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; বরং ছিল নদী, কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের প্রশ্নে গড়ে ওঠা এক বিরাট গণআন্দোলন।

    ১৯৭৬ সালের আজকের এই দিনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে লাখো মানুষ রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। আজও দিনটি ‘ফারাক্কা লংমার্চ দিবস’ হিসেবে স্মরণ করা হয়। বাংলাদেশের পানি অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।  

    ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা এলাকায় গঙ্গা নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে। মূল উদ্দেশ্য ছিল ভাগীরথী-হুগলি নদীতে পানি সরিয়ে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করা। কিন্তু বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) শুরু থেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, এ ব্যারাজ চালু হলে গঙ্গার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কমে যাবে এবং বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গঙ্গা ও পদ্মা নদীর পানির ওপর বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও জীববৈচিত্র্য গভীরভাবে নির্ভরশীল ছিল। ফলে পানিপ্রবাহ কমে গেলে দেশের বিশাল অংশে মরুকরণ, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। 

    বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৫১ সালেই ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনার খবর প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৬১ সালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যারাজ নির্মাণ শুরু করে। পাকিস্তান সরকার তখন ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে আলোচনাও স্থবির হয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালে ব্যারাজের নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং ১৯৭৫ সালে ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কার ফিডার খাল চালু করে। বাংলাদেশ সীমিত পরিমাণ পানি প্রত্যাহারের অনুমতি দিলেও পরে অভিযোগ ওঠে, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও ভারত পানি সরিয়ে নেয়া অব্যাহত রাখে। এর ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোতে পানির প্রবাহ দ্রুত কমতে শুরু করে। 

    ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ কমে যায়, নদীগুলোতে নাব্য সংকট তৈরি হয় এবং কৃষিতে সেচ সমস্যা দেখা দেয়। কোথাও কোথাও নদী শুকিয়ে যেতে থাকে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করতে শুরু করেন যে, দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের কৃষি, বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

    এই সংকটময় সময়ে সামনে আসেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; বরং কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকারের প্রতীক ছিলেন। ১৯৭৪ সাল থেকেই তিনি ফারাক্কার বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না হলে বাংলাদেশের মানুষের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। ১৯৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি ঘোষণা দেন, ভারত যদি বাংলাদেশের ন্যায্য পানি না দেয়, তাহলে ১৬ মে রাজশাহী থেকে ফারাক্কা অভিমুখে শান্তিপূর্ণ লংমার্চ শুরু হবে। তার আহ্বানে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তিনি স্লোগান দেন—‘চলো চলো ফারাক্কা চলো।’ 

    লংমার্চের প্রস্তুতির জন্য ১৯৭৬ সালের ২ মে ‘ফারাক্কা মিছিল পরিচালনা জাতীয় কমিটি’ গঠন করা হয়। শুরুতে ৩১ সদস্যের এই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা ভাসানী; পরে কমিটির সদস্যসংখ্যা ৭২-এ উন্নীত করা হয়। তখন তার বয়স প্রায় ৯০ বছর। অসুস্থতার কারণে কিছুদিন আগেও হাসপাতালে ছিলেন তিনি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বের হয়েই তিনি লংমার্চের নেতৃত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিদেশি সাংবাদিকরাও বাংলাদেশে আসেন এই কর্মসূচি কভার করতে। 

    লংমার্চ ঘোষণার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠিও লিখেছিলেন মওলানা ভাসানী। তিনি সেখানে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্ব অটুট রাখতে হলে ফারাক্কা সমস্যার ন্যায়সঙ্গত সমাধান জরুরি। ইন্দিরা গান্ধীও জবাবি চিঠি পাঠান। তিনি অভিযোগ করেন, ভাসানী ভারতকে ভুল বুঝছেন এবং উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন। জবাবে ভাসানী দৃঢ়ভাবে জানান, তিনি শুধু বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন তুলছেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের আহ্বান জানান।

    অবশেষে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে শুরু হয় ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ। রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ের সংবাদপত্রগুলো লিখেছিল, অঝোর বৃষ্টি ও হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করিয়া দুর্জয় জনতার দীপ্ত মিছিল। মিছিলের শুরুতে সংক্ষিপ্ত ভাষণে মওলানা ভাসানী বলেন, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। তিনি আরও বলেন, এই মিছিল বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রামের প্রতীক।

    রাজশাহী থেকে প্রেমতলী, সেখান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে কানসাট পর্যন্ত প্রায় ৬৪ মাইল দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এই লংমার্চ। পথজুড়ে মানুষ মিছিলকারীদের খাবার, পানি ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। মুষলধারে বৃষ্টি, ধূলিঝড় ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মিছিল থেমে যায়নি। সংবাদপত্রের ভাষ্যমতে, যেদিকে তাকানো যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। মিছিল যত এগোচ্ছিল, ততই নতুন মানুষ যোগ দিচ্ছিল।

    মওলানা ভাসানী আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি ঘোষণা করেন, সব প্রকার উসকানির মুখেও আমরা সীমান্ত অতিক্রম করব না। তার উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি তুলে ধরা, কোনো সংঘাত সৃষ্টি করা নয়। কানসাটে সমাপনী সমাবেশে তিনি সতর্ক করে বলেন, ফারাক্কা সমস্যার সমাধান না হলে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের দরিদ্র, নিরস্ত্র মানুষের ভয়ে ভারতকে যখন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করতে হয়েছে, তখন তার অবিলম্বে ফারাক্কা সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত।

    ফারাক্কা লংমার্চের প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, এটি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফারাক্কা সমস্যাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমে এই লংমার্চ ব্যাপক প্রচার পায়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ফারাক্কা ইস্যু উত্থাপন করেন। জাতিসংঘ দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানায়। 

    লংমার্চের পর কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা গতি পায়। ১৯৭৭ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি চুক্তি হয়, যার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের পানির হিস্যা নির্ধারণ করা হয়। যদিও বাংলাদেশ বরাবরই অভিযোগ করে আসছে যে, চুক্তি অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি সবসময় পাওয়া যায় না। ২০২৬ সালে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকায় বিষয়টি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

    আজও ফারাক্কা লংমার্চ বাংলাদেশের জনগণের কাছে জাতীয় অধিকার রক্ষার প্রতীক। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং পানি, পরিবেশ ও মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সংঘটিত এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছিল, জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি আন্তর্জাতিক ইস্যুকেও বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারে। বাংলাদেশের নদী ও পানিসম্পদ রক্ষার আলোচনায় তাই ফারাক্কা লংমার্চ আজও প্রাসঙ্গিক, অনুপ্রেরণাদায়ী এবং ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

    এইচএ

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    Loading…